হযরত আবুল হাসান সির্‌রী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি

শায়খ আল্লামা ডঃ মুহাম্মদ হুসাইন মোশাহিদ রজভী

ভাষান্তরঃ মুহাম্মদ মহিউদ্দীন।

“হযরতে মা’রুফে কারখী সাহেবে ইলমে আমল,

সির্‌রীও সাক্বতী সিরাজে আউলিয়া কে ওয়াস্তে”

 

হযরত আবুল হাসান সিরিরী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি সিলিসিলায়ে আলীয়া কাদেরিয়া সিরিকোটিয়ার দশম তম শায়খ।  ১৫৫ হিজরী মোতাবেক বাগদাদ নগরীতে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর নাম ‘সিররুদ্‌ দ্বীন’ এবং কুনিয়ত ‘আবুল হাসান’। পরবর্তীতে তিনি সিররী সাক্বতী নামে প্রসিদ্ধ লাভ করেন। তাঁর সম্মানিত পিতার নাম হযরত মুগলিস রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি।

 

এক ওলীর দোয়ার প্রভাব

হযরত সিররী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি’র নিকট লোকেরা আরয করলো যে, হুজুর ! আপনার তরীক্বত জগতের সূচনালগ্নের সময় সম্পর্কে কিছু বলুন। তখন তিনি বললেন, “একদিন মহান বুযর্গ হযরত হাবীব রায়ী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি আমার দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁর খিদমাতে কিছু রুটি পেশ করলাম, যাতে তিনি এগুলো ফকির-মিসকীনদের মাঝে বন্টন করে দেন। সে সময়ে তিনি

আমার জন্য দোয়া করলেন এবং বললেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে নেক কাজের তাওফিক দিন। সেদিন হতেই আমার মন থেকে দুনিয়ার মোহ চলে যেতে লাগলো।”

হযরত সিররী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি হযরত মা’রুফ কারখী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি’র মুরীদ এবং খলীফা ছিলেন। এবং তাঁর নিকট হতেই তিনি ইলমে জাহের এবং ইলমে বাতেন অর্জন করেন।

 

হযরত সিররী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি’র উপদেশ

হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি, যিনি কিনা হযরত সিররী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি’র তাঁর ভাগ্নে ছিলেন; তিনি বলেন, যখন হযরত সিররী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন আমি তাঁকে যিয়ারত করতে গেলাম। তাঁর শিয়রের নিকটে একটি পাখা রাখা ছিল। আমি পাখাটি হাতে নিয়ে তাঁকে বাতাস করতে লাগলাম। তখন তিনি বললেন যে, হে জুনাইদ ! বাতাস বন্ধ কর। কারণ আগুন বাতাসে আরো বাড়ে এবং প্রজ্জলিত হয়। হযরত জুনাইদ রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি বলেন, অতঃপর আমি হযরত সিররী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি’র নিকট আরয করলাম, আপনার বর্তমান অবস্থা কিরুপ ? তখন তিনি বললেন,

عبد مملوک لا یقدرعلی شئ

অর্থাৎ ঐ গোলামের অবস্থা, যার কোন কিছুর এখতেয়ার বা ক্ষমতা থাকে না।

অতঃপর হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি বললেন, আপনি আমাদের উদ্দেশ্যে কিছু উপদেশ দান করুন। তখন তিনি ইরশাদ করলেন যে, “সৃষ্টির সংস্পর্শতার দরুন স্রষ্টা থেকে গাফেল হয়ো না।”  [আর রাওজুল ফায়িক্ব,১১৬]

 

বেসাল মুবারক

হযরত সিররী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি ৯৮ বছর বয়সে ১৩রা রমযানুল মুবারক মোতাবেক ২৫৩ হিজরীতে মঙ্গলবার সুবহে সাদিকের সময় ইন্তিকাল করেন। তাঁর মাজার শরীফ বাগদাদ শরীফে ‘শনীজ’ নামক স্থানে অবস্থিত। আল্লাহ তায়ালা আজ্জা ওয়া জাল্লা তাঁর উপর রহমত বর্ষণ করুন এবং তাঁর উসিলায় আমাদেরকেও ক্ষমা করুন।

ছবিঃ রওশন দলীল ডট কম

 

মদখোরকে নামাজী বানিয়ে দিলেন

হযরত সিররী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি এক সময়ে এক মদখোরকে দেখলেন, যে কিনা নেশার কারণে বেহুশ হয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছিল। এবং সেই নেশাখোর ঐ অবস্থাতেই আল্লাহ ! আল্লাহ ! বলে ডাকছিল। হযরত সিররী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি ঐ নেশাখোরের মুখ পানি দিয়ে ধুয়ে দিলেন এবং বললেন, এই বেহুশের কি বা হুশ আছে যে, সে এই অপবিত্র মুখ দ্বারা কোন পবিত্র সত্বার নাম নিচ্ছে ? তাঁর যাওয়ার পর যখন মদখোর হুশের মধ্যে আসলো, তখন লোকেরা তাকে বলল যে, তোমার বেহুশ অবস্থায় হযরত সিররী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি তোমার নিকট এসেছিলেন এবং তোমার মুখ ধুয়ে দিয়ে চলে গিয়েছেন। মদখোর এই কথা শুনে খুব লজ্জিত হল। অতঃপর সে লজ্জা ও অনুশোচনায় অঝরে কাঁদতে লাগলো এবং নিজেকে উদ্দেশ্য করে বলল, হে বেশরম ! এখন তো হযরত সিররী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহিও তোমাকে এই অবস্থায় দেখে চলে গেছে, খোদাকে ভয় কর এবং ভবিষ্যতের জন্য তাওবা কর। রাতে হযরত সিরিরী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি এক গায়েবী আওয়াজ শুনলেন যে, “হে সিরিরী সাক্বতী ! তুমি আমার জন্য মদখোরের মুখ ধুয়েছো, আমি তোমার জন্য মদখোরের অন্তর ধুয়ে দিলাম।” যখন হযরত সিরিরী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য মসজিদে গমন করলেন, তখন তিনি ঐ মদখোরকে মসজিদে নামাযরত অবস্থায় পেলেন। হযরত সিরিরী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি তাঁর নিকট জিজ্ঞাসা করলেন যে, তোমার অন্তরে এই পরিবর্তন কিভাবে আসলো? তখন সে ব্যক্তি জবাব দিল যে, আপনি একথা আমাকে কেন জিজ্ঞাসা করছেন, যেখানে কিনা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা আপনাকে এই ব্যাপারে অবগত করেছেন। [আর রাওযুল ফায়িক্ব,পৃষ্ঠা ২৪৪]

 

হযরত সিরিরী সাক্বতী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি’র কিছু বাণী

১। ধনী প্রতিবেশী, পেশাদার ক্বারী ও অসচ্চরিত্রের আলেমদের থেকে দূরে থেকো।

২। যেই ব্যক্তি ইচ্ছা করে যে তার দ্বীন-ধর্ম নিরাপদ থাকুক, জান-মালের কল্যান সাধন হোক এবং দুঃখ লাঘব হোক। সে যেন মানুষের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে ।

৩। খাবার এতটুকু গ্রহণ করা উচিত, যতটুকুতে জীবন ধারণ হয়।

৪। চাকচিক্য প্রদর্শনে কাপর পরিধান করা শাস্তির কারণ।

৫। বসবাসের জন্য অট্টালিকা তৈরীতে জান্নাত লাভ হয় না।

৬। সেই এলেম মূল্যহীন, যার উপর আমল করা হয় না।

৭। মু’মিন হচ্ছে সেই, যে কিনা দুনিয়াবী কাজের মাঝেও আল্লাহ থেকে গাফেল হয় না।

৮। (নিজের ব্যাপারে বলেন) হায় ! যদি সমগ্র সৃষ্টিজগতের দুঃখ আমার অন্তরে চলে আসত। তাহলে সবাই নিশ্চিন্তে থাকতো।

৯। যার নিজের ব্যাপারে শিষ্টাচারিতা নাই, সে অন্যদের বেলায় শিষ্টাচারিতা কিভাবে প্রদর্শন করবে ?

১০। তোমরা এমন অনেক লোক পাবে, যাদের কথা ও কাজে কোন মিলে নেই। কিন্তু অনেক কম এমন লোক পাবে, যাদের কাজ তাঁর কথা অনুযায়ী হয়ে থাকে।

১১। সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান হচ্ছে সে, যে কিনা কালামুল্লাহ শরীফ এর আয়াত নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করে এবং এবং তা দ্বারা তদবীর তাফাকীর করে থাকে।

১২। যে নিজের নফসের অনুসারী হয়ে যায়, তার জন্য ধবংস ছাড়া কোন কিছুই থাকে না।

১৩। যে ব্যক্তি চায় তাকে সবাই উচ্চ এবং সম্মানী বলুক, সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।

১৪। সচ্চরিত্র তাকেই বলে, যে চরিত্রের উপর সৃষ্টিকূল সন্তুষ্ট থাকে।

১৫। শুধুমাত্র সন্দেহের উপর নির্ভর করে কারো সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করোনা।

১৬। ঐ ব্যক্তি থেকে দূরে থাকো, যে সম্মানের সহিত মজলিশে বসে এবং অসম্মানিত হয়ে মজলিশ থেকে বাহির হয়।

১৭। প্রকৃত ইশ্‌ক তো সেটাই যা আমল করার স্পৃহাকে বাড়িয়ে দেয়।

১৮। সৎ পথে চলা ব্যক্তির পা মূলতঃ শয়তানের সিনার উপর থাকে।

১৯। ইলমের দৃষ্টান্ত হচ্ছে সমূদ্রের ন্যায়। যতই খরচ কর না কেন, কখনো কমবে না।

২০। যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে যে, তার দ্বীন-ধর্ম নিরাপদ থাকুক। তার দেহ অশান্তি  এবং দুঃখ বেদনা মিশ্রিত বাক্যাবলী শ্রবণ করা থেকে মুক্ত থাকুক; তবে সে যেন মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। আর তা এজন্যই যে, এই যুগে একাকী থাকাই নিরাপদ।

২১। সবচেয়ে বড় শক্তিধর সেই, যে নিজ নফসের উপর জয়ী হয়েছে এবং যে ব্যক্তি তার নিজের নফসকে শিক্ষা দিতে অক্ষম হয়, সে তো অন্যদেরকেও শিক্ষা দিতে এমনিতেই অক্ষম হবে।

২২। তিনটি জিনিস আল্লাহ তায়ালা’র অসন্তুষ্টির আলামত। যথাঃ

ক। অধিক খেলাধুলা।

খ। হাসি ঠাট্টা।

গ। (পরের) গীবত ও (আল্লাহর নিকট) শিকায়ত তথা অভিযোগ।

 

প্রবন্ধ উৎসঃ  http://nafseislam.com/articles/hazrat-syeduna-abul-hassan-sirri-saqti

www.RawshanDalil.com

Advertisements

About ইসলামের বিশুদ্ধ আক্বিদা ও মাসায়েলসমূহ

'আপনিও হোন সঠিক ইসলাম ও আক্বিদার প্রচারক'। প্রবন্ধটি পড়া হলে, নিচের লিংক থেকে Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করুন,।ইসলামের সঠিক আক্বিদার আলো ছড়িয়ে দিন সর্বত্র।কারন রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ইরশাদ করেন যে, "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [মুসলিম শরীফ: ২৬৭৪]

Posted on ডিসেম্বর 15, 2014, in আউলিয়া কথা. Bookmark the permalink. এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: