যাঁর কারনে জগৎ সৃষ্টি

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না।

লিখেছেন,বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা  মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান।

বর্ণিত আছে যে,আল্লাহ তায়ালা চারটি শাখা বিশিষ্ট একটি অতি সুন্দর বৃক্ষ সৃষ্টি করেছেন।সেটার নাম ‘শাজারুল ইয়াক্বীন’(ইয়াক্বীনবৃক্ষ)।অতঃপর আল্লাহ তায়ালা ঐ বৃক্ষের উপর ‘নূর-ই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা’(হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর নূর)-কে একটি ‘তাউস’(ময়ূর)-এর আকারে বসিয়ে দিলেন।তারপর ঐ ‘তাউস’ সেখানে সত্তর হাজার বছর আল্লাহ তায়ালার ‘তাসবীহ’(স্ততিবাক্য)পাঠ বা বর্ণনা করতে থাকে।তারপর আল্লাহ তায়ালা ‘আয়না-ই হায়া’(লজ্জা-দর্পণ)বানিয়ে তাউসের সামনে রেখে দিলেন।তখন আয়নায় তাউস আপন সৌন্দর্য ও লাবন্য দেখে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের দরবারে পাঁচটি সাজদা করলো,যেগুলোকে ‘ফরয’সাব্যস্ত করা হয়েছে।এ কারনে আল্লাহ তায়ালা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর উম্মতের উপর দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্বত নামাজ ফরয করেছেন।

পার্শবর্তী বহুতল ভবন হতে তোলা মসজিদে নববী শরীফ এর রাতের মনোরম দৃশ্য
পার্শবর্তী বহুতল ভবন হতে তোলা মসজিদে নববী শরীফ এর রাতের মনোরম দৃশ্য

তারপর ‘তাউস’ (অর্থাৎ নূর-ই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা)-এর প্রতি যখন আল্লাহ তায়ালা রহমতের দৃষ্টিতে তাকালেন,তখন তিনি লজ্জার ঘামে সিক্ত হয়ে গেলেন।আর ঐ ঘাম মুবারক থেকে মহান স্রষ্টা প্রধান প্রধান সৃষ্টিগুলো সৃষ্টি করেছেন-

►► শির মুবারকের ঘাম শরীফ দিয়ে সমস্ত ফিরিস্তা সৃষ্টি করেছেন।

►► চেহারা-ই আনোয়ারের ঘাম মুবারক থেকে আরশ,কুরসী,লওহ,কলম,সূর্য,চন্দ্র,নূরের পর্দাগুলো তারা-নক্ষরগুলো ও বিশ্বের আশ্চর্যজনক জিনিসগুলো সৃষ্টি করেছেন।

►► তাঁর বিদ্বেষমুক্ত বক্ষ শরীফ এর ঘাম মুবারক হতে নবীগণ,রসূলকুল,আলিম সমাজ,কামিল ব্যক্তিবর্গ,শহীদান ও নেক্‌কার বুযুর্গদের পবিত্র রুহ বা আত্মাগুলোকে সৃষ্টি করেছেন।

►► পৃষ্ঠ মুবারকের ঘাম শরীফ থেকে বায়তুল মা’মুর,কা’বা-ই মুয়াজ্জামাহ,বায়তুল মুকাদ্দাস এবং গোটা সৃষ্টি-জগতে আল্লাহকে সাজদা করার স্থানগুলোকে সৃষ্টি করেছেন।

►► আব্রু শরীফের পবিত্র ঘাম থেকে মু’মিন মুসলিম নর-নারীদের সৃষ্টি করেছেন।

►► আর দু’ক্বদম শরীফের ঘাম নিয়ে পূর্ব।পশ্চিম,উত্তর ও দক্ষিন এবং খনিজ ও আশ্চর্যজনক আরো অনেক কিছু সৃষ্টি করেছেন।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করলেন, “হে আমার মাহবুব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর নূর! “চতুর্দিকে তাকাও!” ওই নূর চতূর্দিকে তাকালো।সর্বত্র নূরের ছড়াছড়ি দৃষ্টিগোচর হল।এ ‘জলওয়া’ বা নূরের ঝলকগুলো ছিল-হযরত আবু বক্বর সিদ্দীক,হযরত ফারুক্ব-ই আযম,হযরত ওসমান গণী ও হযরত আলী হায়দার-ই কার্‌রার রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন এর নূররাশি।তাঁর(হুজুর-ই আকরাম)নূর এমতবস্থায় সত্তর হাজার বছর পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালার দরবারে ‘তাসবীহ’ পড়তে থাকে।

আল্লাহ তায়ালা সমস্ত নবী-রাসূলগনের রুহগুলোকে যখন হুজুর আকরাম হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর নূর থেকে সৃষ্টি করলেন,তখন সমস্ত নবী-রসূলের রুহগুলো সমস্বরে বলে উঠলো-(“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”)।অরথাৎ,আল্লাহ ব্যতিত কোন মা’বুদ(উপাস্য)নাই,হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা আল্লাহর রাসূল।

তারপর আল্লাহ তা’য়ালা ‘আক্বীক-ই আহমার’(লাল বর্ণের আক্বীক)দিয়ে একটি ‘ফানূস’ তৈরী করলেন এবং হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা-এর নূরকে তাঁর পার্থিব আকৃতিতে রুপান্তিত করে ঐ ফানূসের মধ্যে স্থাপন করলেন।ফানূসের মধ্যে তিনি তেমনভাবে দন্ডায়মান হলেন,যেমন নামাজে দাঁড়ানো হয়।তারপর সমস্ত রুহ ওই ফানূসের চতুর্দিক (তাওয়াফ)প্রদক্ষিন করতে লাগলো।রুহগুলোর এমন তাওয়াফ(প্রদক্ষিন)দীর্ঘ এক হাজার বছর যাবৎ চলতে থাকে।

তারপর আল্লাহ তায়ালা রুহগুলোকে নির্দেশ দিলেন- ‘আমার মাহবুবের দিকে তাকাও।’ রুহগুলো নির্দেশ পালন করলো।রুহগুলো থেকে যে ব্যক্তির রুহ হুজুর করীমের-

► শির মুবারকের দেখেছেন,তিনি দুনিয়ার বাদশাহ ও শাসক হয়েছেন।

► আব্রু মুবারক দেখেছেন,তিনি ন্যায়বিচারক শাসক হয়েছেন।

► চক্ষু যুগল দেখেছেন,তিনি প্রশস্ত দৃষ্টি ও প্রশস্ত মনের অধিকারী হয়েছেন।

► কপাল শরীফের দিকে দেখেছেন,তিনি নকশা প্রস্তুতকারী হয়েছেন।

► কান মুবারক দেখেছেন,তিনি সৃষ্টির নিকট গ্রহনযোগ্য হয়েছেন।

► বিদ্বেষমুক্ত বক্ষ মুবারক দেখেছেন,তিনি জ্ঞানী ও উপকার সাধনকারী হয়েছেন।

► নাক মুবারক দেখেছেন,তিনি চিকিৎসক ও আতর প্রস্তুতকারক ও সরবরাহকারী হয়েছেন।

► ওষ্ঠ মুবারক দেখেছেন,তিনি উজির(মন্ত্রী)হয়েছেন।

► দাঁত মুবারক দেখেছেন,তিনি সুন্দর ও সুশ্রী হয়েছেন।

► রসনা মুবারক দেখেছেন,তিনি বাদশাহর দূত(রাষ্ট্রদূত)হয়েছেন।

► কন্ঠণালী শরীফ দেখেছেন,তিনি ওয়ায়েজ,উপদেশদাতা ও মুয়াজ্জিন হয়েছেন।

► দাঁড়ি মুবারক দেখেছেন,তিনি আল্লাহর পথে জিহাদকারী হয়েছেন(ধর্মীয় যোদ্ধা)।

► ঘাঁড় মুবারক দেখছেন,তিনি ব্যবসায়ী হয়েছেন।

► হাত মুবারক দেখেছেন,তিনি দানশীল হয়েছেন।

► আঙ্গুল শরীফগুলো দেখছেন,তিনি সুন্দর হস্তাক্ষর বিশিষ্ট হয়েছেন।

► উদর মুবারক দেখেছেন,তিনি ধৈর্যশীল ও অল্পে তুষ্ট হয়েছেন।

► স্কন্ধযুগল শরীফ দেখেছেন,তিনি ইবাদত পরায়ন ও দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত বুযুর্গ হয়েছেন।

► পদযুগল মুবারক দেখেছেন,তিনি আল্লাহর পথে হিজরতকারী হয়েছেন।

► নখ শরীফ দেখেছেন,তিনি বিচারপতি,মুফতী কিংবা জজ হয়েছেন।

কিন্তু যে সব রুহ হুজুর-ই মুবারক আকরামকে মোটেই দেখেনি,সে ইহুদী,খ্রিষ্টান,অগ্নিপূজারী কিংবা ফেরাউন হয়েছে।আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাতা।

হে নবী ! আপনার উপর অসংখ্য সালাম ও দুরুদ প্রেরণ।
হে নবী ! আপনার উপর অসংখ্য সালাম ও দুরুদ প্রেরণ।

 যেই সৌভাগ্যবানের কোলে আকাশের চাঁদ ও সূর্য নেমে এসেছেঃ-

সাইয়েদুনা সিদ্দীকে আকবর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অন্ধকার যুগে খুব বড় ব্যাবসায়ী ছিলেন।ব্যবসার উদ্দেশ্যে তিনি সিরিয়া গেলে সেখানে তাঁর সাথে এমনি এক ঘটনা ঘটল,যা তাঁর ইসলাম গ্রহনের কারণ হয়েছিল।তিনি সেখানে এক আজব স্বপ্ন দেখলেন।স্বপ্নটি হল-চাঁদ ও সূর্য তাঁর কোলে নেমে এসেছে।আর তিনি ঐ দুটোকে চাদরে জড়িতে নিয়ে আপন  বুকের সাথে লাগাচ্ছিলেন।জাগ্রত হয়ে তিনি এ স্বপ্নের ব্যখ্যা জানার জন্য পার্শ্ববর্তী এক ধর্ম যাজকের(রাহিব)নিকট গেলেন।তিনি রাহিবকে স্বপ্নের পূর্ণ বর্ণনা দিলেন।তারপর আরম্ভ হল কথোপকথন।

:আপনার নাম?

:আবু বকর।

:আপনি কোন শহরের বাসিন্দা?

:মক্কার আদিবাসী।

:কোন গোত্রের?

:বনূ হাশিমের।

:কি কাজ করেন?

:ব্যবসা বানিজ্য।

এসব কথা শুনে ধর্মযাজক বললেন,শেষ জামানায় এমন এক মহান ব্যক্তি পয়দা হবেন,যার নাম শরীফ-মুহাম্মদ।আর উপাধি হবে-আল-আমিন,(মহাবিশ্বস্ত)সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা।তিনি শেষ জামানার নবী।তিনিও বনু হাশিম গোত্রের হবেন।তিনি সৃষ্টি না হলে কিছুই সৃষ্টি হত না।তিনি পূর্বাপর সবার সর্দার(সাইয়েদুল আওয়ালিন ওয়াল আখিরিন)

রাহিব হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর এভাবে প্রশোংসা করতে করতে এক পর্যায়ে সিদ্দীকে আকবরকে বললেন আপনি ধণ্য।আপনি সর্বপ্রথম তাঁর উপর ঈমান এনে তাঁর উজির হবেন।তিনি যখন দুনিয়া থেকে অন্তরাল গ্রহন করবেন।তখন আপনি মুসলমানদের খলিফা হবেন।এটাই হচ্ছে আপনার স্বপ্নের ব্যাখ্যা।পরিশেষে ওই রাহিব আরেক আজব কথা বললেন।তিনি বললেন, “আমি তাওরাত,ইঞ্জিল ও যাবুর কিতাবে তাঁর প্রশংসাদি পড়েছি;আর আপনিও শোনেন,আমি তাঁর উপর ঈমান এনেছি;কিন্তু খ্রীষ্টানদের ভয়ে আমি আমার ঈমানকে প্রকাশ করিনি।”

রাহিবের কথা শুনে সিদ্দীক্ব-ই আকবরের হৃদয় গলে গেলো।হুজুর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর সাক্ষাৎ লাভের জন্য তিনি তখন থেকে ব্যাকুল হয়ে পড়লেন।তিনি মক্কায় ফিরে এসেই হুজুর-ই আকরামের মহান দরবারে হাযির হয়ে গেলেন।হুজুর-ই আকরামের চাঁদ ও সূর্য অপেক্ষা সুন্দর আলোকজ্জল চেহারা-ই আক্বদাস দেখে মনের অনাবিল শান্তি উপভোগ করলেন।তখনকার দিনে হুজুর দ্বীন-ইসলামের প্রতি মানুষকে দাওয়াত দিয়েই যাচ্ছিলেন।হুজুর তখন সিদ্দীক্বে আকবরের উদ্দেশ্যে ইরশাদ করলেন-

“তুমি প্রতিদিন আমার নিকট এসে থাকো,কিন্তু ইসলাম কেন গ্রহন করছ না?” সিদ্দীক্বে আকবর আরয করলেন। “যদি আপনি আল্লাহর নবী হন তবে মু’জিযা দেখান।”

সিদ্দীক্বে আকবরের একথা শুনে হুজুর মুচকি হাসলেন আর বললেন, “তুমি সিরিয়ার যেই স্বপ্ন দেখেছো আর রাহিব তোমার স্বপ্নের যেই ব্যাখ্যা দিয়েছে,সেটা কি তোমার ইসলাম গ্রহনের জন্য যথেষ্ট নয়?”

একথা শুনে হযরত সিদ্দীক্বে আকবর উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, “আপনি সত্য বলেছেন।আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে,আলাহ ব্যতিত কোন মা’বুদ(উপাস্য)নাই,হে মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!আপনি আল্লাহর সত্য রসূল।”একথা বলে তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় প্রবেশ করে উম্মতের মধ্যে সর্বোচ্চ আসনে আসীন হন।তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী।নবীগণের পর তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ।(রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

তথ্যসূত্রঃ-‘জামে’উল মু’জিযাত’ কৃতঃ শায়খ আল্লামা মুহাম্মদ রাহাভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি।

Advertisements

About ইসলামের বিশুদ্ধ আক্বিদা ও মাসায়েলসমূহ

'আপনিও হোন সঠিক ইসলাম ও আক্বিদার প্রচারক'। প্রবন্ধটি পড়া হলে, নিচের লিংক থেকে Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করুন,।ইসলামের সঠিক আক্বিদার আলো ছড়িয়ে দিন সর্বত্র।কারন রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ইরশাদ করেন যে, "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [মুসলিম শরীফ: ২৬৭৪]

Posted on জানুয়ারি 18, 2013, in আক্বাইদ, ইসলামী জিন্দেগী, ইসলামী সংবাদ, ইসলামের ইতিহাস, ঈদে মিলাদুন্নাবী, ফাযায়েল, বিবিধ, শান্তির ধর্ম ইসলাম. Bookmark the permalink. মন্তব্য দিন.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: